আশিকুর রহমান শান্ত,
দৈনিক ভোলা টাইমস্ ::ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার মাদ্রাজ ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের মোহাম্মদপুর গ্রামে ভোলার সবচেয়ে বড় জনবহুল সাম্রাজ মাছ ঘাট সংলগ্ন মেসার্স ক্রাউন ব্রিকস এর মালিক সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে অবাধে কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করছে ইট। এই ইউনিয়নে রয়েছে বেশ কিছু এলাকা জুড়ে সরকারী বনায়ন। অভিযোগ রয়েছে সেই বনায়ন থেকে মেসার্স ক্রাউন ব্রিকস অসৎ উপায়ে গাছ সংগ্রহ করে তা দিয়েই ইটভাটা চালাচ্ছে। এছাড়াও এই ইটভাটাটির মালিক নিজের ক্ষমতা ও জোর খাটিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশাল এরিয়া দখল করে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করেছে। টেকসই বেরিবাঁধ এর উপর পাটা গুলো সরিয়ে নিজের খেয়াল খুশির মতো তৈরি করে নিয়েছেন থাকার ঘর।
তথ্য নিয়ে জানা যায়, এই ইটভাটাটির কোন ধরনের লাইসেন্স নেই, নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। কোন ধরনের লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এবং ফসলি জমিতে স্থাপন করা হয়েছে এই অবৈধ ইটভাটা। শুধু তাই নয়, ভাটায় প্রকাশ্যে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। কাঠ পোড়ানোর জন্য কাঠ গুলো উপযোগী করতে এখানে বসানো হয়েছে একটি করাত কল। হলে ইচ্ছামত পূরণ হচ্ছে কাঠ, এতে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। আইন অমান্য করে দিনের পর দিন এই ইটভাটাটি চললেও প্রশাসনের নজরে আসেনি এখনো। প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় একাধিক বাসিন্ধা অভিযোগ করে বলছেন এ সকল প্রভাবশালীরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এই অবৈধ ইটভাটা গুলো চালাচ্ছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এই ইটভাটায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষি জমির মাটি। ফলে একদিকে নির্বিচারে উজাড় হচ্ছে বন, অন্যদিকে উর্বরতা হারিয়ে চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ছে আবাদী জমি। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, এই অবৈধ ইটভাটা গড়ে ওঠার কারণে শত শত একর ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইটভাটার এক শ্রমিক জানালেন, সাধারণত এই ভাটায় বছরে ৪০ থেকে ৫০ লাখ ইট পোড়ানো হয়। আর প্রতি আট হাজার ইটের জন্য কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার হয় এক হাজার ঘনফুট মাটি। সেই মাটির জোগান আসে কৃষি জমি থেকে। এজন্য বছরে ৫ থেকে ৬ একর জমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করা হয় এই ইটভাটায়।
তিনি আরও জানান, ইট পোড়ানোর জন্য প্রতিটি ভাটায় দৈনিক গড়ে ৪০০ মণ কাঠ পোড়াতে হয়। কাঠ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেও জানা গেছে এই তথ্যের সত্যতা। ক্রাউন ব্রিকস এর মালিক ভোলার বিভিন্ন গ্রাম ও সরকারি বনায়ন থেকে অবৈধ মাধ্যম ব্যবহার করে কাঠ এনে এই ভাটায় পোড়ায়। গড়ে প্রতিটি গাছ থেকে সাত থেকে আট মণ কাঠ পাওয়া যায়।
ভাটায় ঘুরে দেখা গেলো, আম, জাম, রেন্ট্রি, কদম, জামরুল, কাঁঠাল, খেজুর, নারকেল, কেরপা, কেয়া সহ তিন শতাধিক ফলজ ও বনজ গাছ পোড়ানো হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭-এর ৭ ধারা অনুযায়ী কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানোকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এ আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রথমবার সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে ১ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও সাজার বিধান রাখা হয়েছে। তৃতীয়বার এ অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে ভাটার নিবন্ধন বাতিল ও ভাটা বাজেয়াপ্ত করারও বিধান রাখা হয়েছে। কাগজে-কলমে এসব আইন বাস্তবায়নে কঠোর নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগের দেখা মিলেনি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার এই অবৈধ ইটভাটায়।
এদিকে, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-তে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা, হাট-বাজার এলাকা; সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর; এবং বন, অভয়ারণ্য, বাগান, জলাভূমি ও কৃষি জমিতে ইট ভাটা স্থাপন করা যাবে না। সংরক্ষিত বনের ৫ কিলোমিটারের বাহিরে ইটভাটা করার বিধান থাকলেও মানা হচ্ছে না তা।
ইটভাটার ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষণ ছাড়াও স্থানীয়রা নানা ধরনের সমস্যার কথা জানাচ্ছেন। মাদ্রাজ ইউনিয়নের কৃষক মোসলেউদ্দিন, জামাল, আরিফ সহ স্থানীয় কয়েকজন কৃষক বলেন, ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় ফসলি জমির ক্ষতি হচ্ছে। ক্ষেতের পাশে ইটভাটা গড়ে ওঠায় আগের তুলনায় উৎপাদন কমে গেছে। সরকার ফসলি জমির ওপর ইটভাটা স্থাপন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পাঁচ বছরের মধ্যে এসব জমির উৎপাদন শূন্যে নেমে আসবে।
স্থানীয়রা আরও বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের মধ্যে শ্বসনতন্ত্রের রোগব্যধিতে আক্রান্ত হওয়ার পরিমাণ বেড়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে অসুস্থতা বেড়েছে।
অবৈধ ভাবে ইটভাটা চালানো ও কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে মেসার্স ক্রাউন ব্রিকস এর মালিক জালাল উদ্দিন রুমি বলেন, চরফ্যাশনে কোন ইটভাটার লাইসেন্স আছে ? আমার কোন লাইসেন্স নেই আপনারা যা খুশি লিখেন যা পারেন করেন বলে ফোন কেটে দেন।
এ বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ মামুন বলেন, এটির কোন অনুমোদন নেই তা সঠিক। কোন ধরনের লাইসেন্স বা অনুমতি ছাড়া গড়ে ওঠা ইটভাটা কিভাবে মালিক সমিতির অন্তর্ভুক্ত হয় তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, চরফ্যাশন উপজেলায় ২২টি ঝিকঝাক ইটভাটা রয়েছে। তার মধ্যে ১২টি ইটভাটার লাইসেন্স আছে বাকি গুলোর লাইসেন্স নেই। লাইসেন্স না থাকার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন সরকার গত দুই আগে অর্ডার করেছে নতুন ভাবে কোন ধরনের লাইসেন্স দেওয়া হবে না।
অবৈধ ইটভাটাটি ক্রাউন ব্রিকস ভাবে চলছে এ ইটভাটার বিষয়ে আইনি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তোতা মিয়া বলেন এটি আমাদের নলেজে আছে। আমরা ভাটায় অভিযান পরিচালনা করেছি। খুব শিঘ্রই এই অবৈধ ইটভাটাটিতেও অভিযান পরিচালনা করা হবে।
অবৈধ ইটভাটা পরিচালনার বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ লোকমান হোসেন বলেন, ইতিমধ্যেই আমরা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একজন ম্যাজিস্ট্রেট এর নেতৃত্বে অবৈধ ইটভাটা ও কাঠ পোড়ানোর দায়ে কয়েকটি ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা কর
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক- মোঃ আলী জিন্নাহ (রাজিব), ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক- মোঃ হেলাল গোলদার, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়- আমানত পাড়া, ভোলা। ই-মেইল- news.bholatimes@gmail.com, মোবাইল- ০১৭১১৪৬৯৫৩৯
Bhola Times © All rights reserved.